রাজধানী উন্নয়ণ কর্পোরেশন (রাজউক) এর ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আব্দুল মোমিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও থেমে নেই তার পদোন্নতি। তিনি চাকুরি শুরু করেন ১৯৯৮ সালে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কাজ দিয়ে। তিন বছরের মাথায় ২০০১ সালে চাকুরিচ্যুত করা হয়, তারপর ২০০৯ সালে চাকুরি ফিরে পেতে মামলা করেন এবং হাইকোর্টের নির্দেশে ২০১৩ সালের দিকে চুক্তিভিক্তিক চাকুরি ফিরে পান। তার ঠিক চার বছর পর ২০১৭ সালের দিকে চাকুরি স্থায়ী হয় মোমিনের। চাকুরি নিয়ে এত সংগ্রাম শেষে স্থায়ী হওয়ার পরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট।
বিত্ত বৈভবে ফুলে ফেঁপে উঠেন মোমিন। তারপর পেছনে ফিরে দেখতে হয়নি এককালে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কাজ করা ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আব্দুল মোমিনের।
গত ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী আব্দুল মোমিন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর থেকে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমেই কাননগো পদে পদোন্নতি নিয়েছেন বলে রাজউকের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন।
রাজউক এই কর্মচারী ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আব্দুল মোমিনের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে প্ল্যান পাশ, প্লট হস্তান্তর, প্লট বিক্রয়ের দালালী, আবাসিক ভবনকে অ-আবাসিক বা বাণিজ্যে রুপান্তর, নারী কেলেঙ্কারি ইত্যাদি অবৈধ কাজের অভিযোগ রয়েছে। মোমিনের নারী কেলেঙ্কারী এবং স্পা সেন্টার নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে। এবিষয়ে এই প্রতিবেদকের কাছে তথ্য প্রমান রয়েছে।
আব্দুল মোমিন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৭১ নং ওয়ার্ডে ৫ কাঠা জমির উপর ‘শান্তির নীড় সুলতানা মহল’ নামে সাত তলা আলিশান ভবন যার বর্তমান বাজার মূল্য আনুমানিক ১৫ কোটি টাকার উপরে।
এছাড়া, মান্ডা মদিনা টাওয়ারের পাশে সাততলা ভবন নির্মাণ করছেন তিনি। মতিঝিলের জসিম উদ্দিন রোডে ১৮০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট কিনেছেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায় আব্দুল মোমিন অনিয়ম ও দুর্নীতির টাকায় স্ত্রীর নামে রয়েছে রাজউক পূর্বাচলে প্রায় কয়েক কোটি টাকা প্লট। স্বর্ণ চোরাচালান করে রাতারাতি শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনির রাজউক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় সেখানেও নাম এসেছে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আব্দুল মোমিনের। তার নিজের ব্যবহার করা প্রাইভেট কারের বাজার মূল্য ৩৫ লাখ টাকার উপরে।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনেও তার সম্পদের সত্যতাও পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, উচ্চ আদালতের পৃথক দুটি সুয়োমুটো (স্বতঃপ্রণোদিত) রুলের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে রাজউকের ২৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক। এর মধ্যে একটি অনুসন্ধানে ১৬ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর পর কয়েক জনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই দুদকে অনুসন্ধান চলমান ছিল। রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাদের বিরুদ্ধেই অনুসন্ধান চালানো হয় তাদের মধ্যে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আবদুল মোমিন অন্যতম।
রাজউকের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেখ পরিবারের এক সদস্যের বাসায় নিয়মিত যাতায়ত করতেন মোমিন, সে প্রভাব তিনি রাজউকেও দেখাতেন এবং তার প্রভাবেই দুদকের মামলা ও রাজউকের অভিযোগ ধামাচাপা দিতে পেরেছিলেন। এছাড়া তিনি রাষ্ট্রপতি তার আত্মীয় পরিচয় দিতেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দুদকের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরেও নির্বিঘ্নে একই কাজ করছেন এন্ট্রি অপারেটর আব্দুল মোমিন। রাজউক কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রতিবেদক তা জানার চেষ্টা করেও ব্যার্থ হয়। এ বিষয়ে রাজউক কোনো কর্মকর্তা গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে চায়নি।
রাজউকের অধিকাংশ অভিযুক্ত লগুদন্ডেই পার পেয়ে যাওয়ার নজিরও আছে বলে মন্তব্য করেন আইনজীবী সায়মে আহমেদ। তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তদের শাস্তি নিশ্চিত করে তা জনসম্মুখে আনতে হবে, দুর্নীতিবাজদের সামাজিক ভাবেও বয়কট করতে হবে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমরা তেমন নজির কম দেখতে পাই বিশেষ করে রাজউককে, কারণ এদের অনেক কালো টাকা, তারা ফন্দি ফিকির করে কোনো না কোনো ভাবে বেঁচেই যায়।
দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত রাজউকের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিটও দেওয়া হয়েছে।
যদিও, গত সরকারের আমলে তা ধামাচাপা পরে। রাজউক সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি মনে করেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমালে যে সব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি তারা সকলেই শেখ হাসিনা সরকারের মদদপুষ্ট, এসব অভিযোগ আবার আমলে নিয়ে পুনরায় তদন্ত করলে সম্পদের তথ্য এসেছে তার কয়েকগুণ বেশি সম্পদ পাওয়া যাবে। এবং তাদের শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে যেন সরকারি যে কোনো প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি বিরোধী বার্তা পৌঁছায়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে রাজউকের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আব্দুল মোমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি, উল্টো বিভিন্ন অপরিচিত নম্বর থেকে সংবাদ প্রচার না করার জন্য হুমকি ধামকি দেন।
এই বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা, বিপিএএ বলেন, বর্তমানে রাজউকের বেশকিছু কর্মচারির মামলা হাইকোর্ট দেখছেন। পাশাপাশি দুদকও খোজ-খবর নিচ্ছেন। আমার মতে কোন অনিয়ম করা ঠিক না। যারা করবে তারা আইনের আওতায় আসবে। আইন তাদের বিচার করবে। যেহেতু এখনো তদন্ত চলছে এর বাহিরে আর কিছু বলা যাবে না।